মো. ফারুক, পেকুয়া;

কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় জনপদ পেকুয়া দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পেকুয়া একটি আধুনিক, দুর্যোগ-সহনশীল এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ উপজেলায় পরিণত হবে।

পেকুয়ার উন্নয়নে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। পেকুয়া সড়ক সংস্কারের জন্য ৩০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সোনালী ব্যাংকের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

এ ছাড়া আনোয়ারা–বাঁশখালী–টইটং–পেকুয়া–বদরখালী–চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সড়ক বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার কমে আসবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার হবে।

অন্যদিকে পেকুয়া সদরের একাংশে পৌরসভা এবং অপর অংশে ইউনিয়ন পরিষদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয়দের মতে, পেকুয়ায় বেসরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থাকলেও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় না থাকায় নারী শিক্ষার প্রসারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের সরকারি কলেজ না থাকায় শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য দূরবর্তী এলাকায় যেতে হচ্ছে।

তাই একটি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু, সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা এবং জিয়া কলেজ ও বিএম কলেজের পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস নির্মাণ ও আধুনিকায়নের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও স্থানীয়দের মতে, জনসংখ্যা ও চাহিদার তুলনায় এটি এখনও অপর্যাপ্ত। তাই আইসিইউ, এনআইসিইউ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবাসহ একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে।

প্রতি বর্ষায় মাতামুহুরী নদীর ভাঙনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ কারণে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষায় স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন উপকূলবাসী। বিশেষ করে উজানটিয়া, মগনামা, রাজাখালী ও মেহেরনামা এলাকার বেড়িবাঁধ টেকসইভাবে সংস্কার ও সংরক্ষণের দাবি জোরালো হয়েছে।

একই সঙ্গে পাহাড় কাটা বন্ধ, বনভূমি দখলমুক্ত রাখা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

ঐতিহ্যবাহী ভোলাখাল, কহলখালী খাল, পঁচাকইরলা খাল এবং টইটং ছাগলনাইয়া খালসহ বিভিন্ন খাল দখলমুক্ত করে পুনঃখননের দাবি উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, এসব খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনলে জলাবদ্ধতা কমবে এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর হয়ে থাকা রাবার ড্যাম সংস্কার এবং কৃষি সেচব্যবস্থা উন্নয়নের দাবিও জানানো হয়েছে।

দেশের অন্যতম লবণ উৎপাদনকারী অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও লবণচাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই সরকারিভাবে লবণের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ, বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং একটি সরকারি খাদ্যগুদাম স্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে।

পেকুয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মহেশখালী ও মাতারবাড়ীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের জন্য উজানটিয়া–করিয়ারদিয়া সেতু, উজানটিয়া–মাতারবাড়ী সেতু এবং রাজাখালী–ছনুয়া সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এ ছাড়া পেকুয়ার প্রধান সড়কগুলো চার লেনে উন্নীতকরণ, পেকুয়া বাজারে ফ্লাইওভার নির্মাণ, আধুনিক বাস টার্মিনাল স্থাপন এবং মগনামা ঘাটের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নের দাবিও স্থানীয়দের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।

পেকুয়া উপজেলার সাত ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট এবং জনসেবামূলক অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। এসব অবকাঠামো দ্রুত সংস্কার ও উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

তরুণ ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা উপজেলা অডিটোরিয়াম সংস্কার, আধুনিক ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় বিদ্যমান সাইক্লোন শেল্টার সংস্কার এবং নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের দাবিও জানিয়েছেন উপকূলবাসী।

ইতোমধ্যে জানা গেছে, শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের চকরিয়া-পেকুয়া সফরকালে বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়ে ইতিবাচক ঘোষণা আসতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও তদারকি করছেন।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, কৃষক, লবণচাষি এবং তরুণ সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, সরকারের অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের এসব দাবিও বাস্তবায়িত হলে পেকুয়ার উন্নয়নের নতুন অধ্যায় সূচিত হবে।

তাদের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে পেকুয়াকে একটি আধুনিক, শিক্ষাবান্ধব, বিনিয়োগ-উপযোগী, দুর্যোগ-সহনশীল এবং সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।